বিদেশে পলাতক দুই পলাতক আসামির পরিবর্তে অন্য দুই ব্যক্তিকে আসামি সাজিয়ে আদালত থেকে জমিন নিলেন আইনজীবী
মোহাম্মদ রফিকুল ইসলাম, লক্ষ্মীপুর:
লক্ষ্মীপুরে একটি হত্যাচেষ্টা মামলায় গ্রেপ্তারি পরোয়ানাভুক্ত দুই আসামি পালিয়ে বিদেশ চলে গেলেও অন্য দুই ব্যক্তিকে আসামি সজিব ও সাইফুল ইসলাম শুভ সাজিয়ে আদালত থেকে জামিন নেওয়ার ঘটনায় লক্ষ্মীপুরের আদালত অঙ্গনে তোলপাড় চলছে। মামলার মূল আসামি সজীব ও সাইফুল ইসলাম শুভ জামিন নেওয়ার আগেই দেশের বাইরে সৌদী আরব ও কাতারে পালিয়েগেছে।
অথচ আসামি পক্ষের আইনজীবী মেঃ লুৎফুর রহমান গাজী বিদেশে পলাতক দুই আসামির নাম-পরিচয় ব্যবহার করে অন্য দুই ব্যক্তিকে আদালতে হাজির করে জামিন করিয়ে নিয়েছেন। আসামি পক্ষের আইনজীবী মোঃ লুৎফুর রহমান গাজী জেলা আওয়ামী লীগের দপ্তর সম্পাদক ও লক্ষ্মীপুর জেলা আইনজীবী সমিতির কার্যকরি কমিটির সাবেক সদস্য এবং আওয়ামী আইনজীবী ফোরামের প্রভাবশালী নেতা বলে জানা গেছে।
এ প্রতারণার এ বিষয় জানতে পেরে মামলার বাদী শামছুর নেছা গত ৮ ডিসেম্বর চীফ জুডিশিয়াল ম্যাজিষ্ট্রেট আদালতে লিখিত অভিযোগ করেছেন।
উক্ত অভিযোগের প্রেক্ষিতে আসামীদের আইনজীবীকে কারণ দর্শানোর নির্দেশ এ আসামী সজীব ও সাইফুল ইসলাম শুভ সেজে জামিন নেওয়া উক্ত দুই ব্যাক্তি সহ জড়িতদের গতকাল বুধবার দুপুর ১২ টায় জুডিশিয়াল ম্যাজিষ্ট্রেট আমলী আদালত রামগঞ্জ এর বিচারক মো. ইসমাইলের আদালতে হাজির করার জন্য নির্দেশ দেন। তবে এদিন আদালতে বিচারক মো. ইসমাইল ছুটিতে থাকায় এদিন কোন শুনানি হয়নি। আগামী ১৩ জানুয়ারি পরবর্তী শুনানির জন্য রাখা হয়েছে। বলে বাদীর আইনজীবি মো. রায়হান ইসলাম নিশ্চিত করেছেন। তবে যা আসামি সেজে জামিন নেওয়া দুই ব্যক্তি আদালতে হাজির হননি। আদালতে উপস্থিত করা উক্ত ভূয়া ব্যক্তিদের নাম-পরিচয় জানা যায়নি।
সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত রামগঞ্জ এর পেশকার মোরশেদ আলম খবরের কাগজকে নিশ্চিত করেছেন।
সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত রামগঞ্জ এর সহকারি পাবলিক পসিকিউটর আব্দুল আহাদ শাকিল খবরের কাগজকে জানান, এটি একটি নিন্দনীয় ঘটনা। তবে জামিন নেওয়ার সময় তিনি দায়িত্বে ছিলেন না।
আসামিপক্ষের আইনজীবী মোঃ লুৎফুর রহমান রহিম গাজী খবর কাগজকে জানান, আদালতে তিনি কারণ দর্শানোর আদেশের প্রেক্ষিতে লিখিত জবাব দিয়েছেন। তিনি জানান, তার সহকারী( মুহুরী) আবুল কাশেম মামলার ২ ও ৪ নম্বর আসামি প্রবাসে থাকার বিষয়টি গোপন রেখে অন্য দুই ব্যক্তিকে আসামি শুভ ও সজীব সাজিয়ে তার কাছে জামিনের জন্য উপস্থাপন করেছেন। এই প্রতারণার বিষয়ে তিনি কিছুই জানতেন না এবং তার সংশ্লিষ্টতা ছিল না। বিষয়টি নিয়ে তিনি আদালত, আইনজীবি সমিতির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের কাছেও লিখিত ব্যাখ্যা দিয়েছেন। এ চাঞ্চল্যকর ঘটনাটি এতদিন গোপন থাকলেও মঙ্গলবার দুপুরে বাদীর আইনজীবী জনসম্মুখে প্রকাশ করেন।
আদালত ও সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানাযায়, রামগঞ্জ উপজেলার ইছাপুর ইউনিয়নের সোন্দড়া গ্রামের আবদুল খালেকদের সঙ্গে একই এলাকার তাজুল ইসলাম খোকাদের জমিসহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে বিরোধ চলে আসছে। এ বিরোধীদের ধরে আসামি পক্ষ বাদীপক্ষের উপর হামলা চালিয়ে তাদের পিটিয়ে আহত করে। এ নিয়ে ২০২৩ সালে আদালতে মামলা হয়। ২০২৪ সালের ১৯ মে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ও রামগঞ্জ থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) মো. মনিরুজ্জামান আদালতে চার আসামিতাজুল ইসলাম খোকা, সজীব, আনোয়ার হোসেন ও সাইফুল ইসলাম শুভর বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দাখিল করেন। এদিকে মামলা দায়ের পর আসামি সজিব সৌদি আরব ও সাইফুল ইসলাম শুভ কাতার চলে যায়।
গত বছর ৩০ জুন আসামি খোকা ও আনোয়ার আদালতে আত্মসমর্পণ করে জামিন নেয়। তখন পলাতক আসামি সজিব ও সাইফুলের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারী পরোয়ানা জারি করেন আদালতের বিচারক। আসামিরা বর্তমানেও বিদেশে অবস্থান করছেন । কিন্তু গত ৬ নভেম্বর মামলার ২ ও ৪ নম্বর আসামির স্থলে ভিন্ন ব্যক্তিদের আইনজীবী মোঃ লুৎফুর রহমান গাজী ওকালাত নামা দিয়ে রামগঞ্জ আমলী আদালতে উপস্থিত করে জামিন প্রার্থনা করেন।। আদালত আসামিদের জামিন প্রদান করেন।
ঘটনাটি জানতে পেরে গত ৮ ডিসেম্বর মামলার বাদী শামছুর নেছা চীফ জুডিসিয়াল ম্যাজিষ্ট্রেট আদালতে আসামি সজিব ও সাইফুলকে স্বশরীরে হাজির করার ও তাদের জামিনের আদেশ বাতিল করতে আবেদন করে। একইসঙ্গে আসামিদের নিযুক্ত কৌশুলী ও স্থানীয় জামিনদারের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের প্রার্থনা জানিয়ে আবেদন করেছেন।
এতে আদালতের বিচারক ঘটনাটি নিয়ে সংশ্লিষ্টদের কাছে ব্যাখ্যা জানতে চায়। পরে ২৯ ডিসেম্বর আসামিদের আইনজীবী রহিম গাজী আদালতে লিখিত ব্যাখ্যা দেন। একই ব্যাখ্যা আইনজীবী সমিতির সভাপতি-সম্পাদককে দিয়েছেন। এতে তিনি জানান, আইনজীবী সহকারী আবুল কাশেম দুইজন লোককে এনে আসামি হিসেবে আদালতে উপস্থিত করায়। পরে তাদেরকে জামিন করানো হয়। তিনি আসামিদেরকে ছিনতেন না।
বুধবার লক্ষ্মীপুর আদালত প্রাঙ্গনে মামলার বাদি শামসুন নেছার পুত্রবধু সালমা বেগম খবরের কাগজকে বলেন, তার শাশুড়ি অসুস্থ থাকায় আজ আদালতে উপস্থিত হতে পারেননি। মামলার আসামিরা তাদের প্রতিবেশী। আসামি সজীব ও সাইফুল ইসলাম শুভ এখনো বিদেশে অবস্থান করছেন। তিনি এই ঘটনার সাথে জড়িত ব্যক্তিদের দৃষ্টান্তমূলক বিচার দাবি করেন। আইনজীবী মোঃ লুৎফুর রহমান গাজীর এমন প্রতারণার বিষয়ে লক্ষ্মীপুর জেলা আইনজিবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক এডভোকেট রহমতউল্লা বিপ্লবের মতামত জানতে চাইলে তিনি কোন মন্তব্য জানাতে রাজি হননি।
উল্লেখ্য গত ৪ আগস্ট বৈষম্য বিরোধী আন্দোলন চলাকালে লক্ষ্মীপুর আদালত বন্ধনে বৈষম্য বিরোধী আন্দোলনের সমর্থকদের উপর আইনজীবী মোঃ লুৎফুর রহমান গাজীর নেতৃত্বে ছাত্রলীগ যুবলীগ ক্যাডাররা অতর্কিত হামলা চালিয়ে আইনজীবী নূর মোহাম্মদ সহ কয়েকজন আইনজীবীকে আহত করে। এসময় উপস্থিত জনতা ও আইনজীবীদের প্রতিরোধের মুখে লুৎফুর রহমান গাজী পাশ্বের রহমত খালি খালের পানিতে ঝাঁপ দিয়ে পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়। এরপর থেকে দীর্ঘদিন সে আদালতে অনুপস্থিত ছিল বলে জানিয়েছেন আইনজীবী নূর মোহাম্মদ সহ কয়েকজন।

৩৭.২৩°সে