লক্ষ্মীপুর কারা ফটকে মায়ের জন্য দাঁড়িয়ে থাকা দুই শিশুর ছবি ভাইরাল। নেপথ্যের কাহিনী 
লক্ষ্মীপুর প্রতিনিধি,
লক্ষ্মীপুর কারাগারের সামনে হাজত বন্দি মায়ের জন্য স্কুল ড্রেসপরা ও বই হাতে নির্বাক দাঁড়িয়ে থাকা দুই শিশুর ছবি সোস্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হয়ে পড়েছে। সোস্যাল মিডিয়ায় এ ছবি দেখে নেটিজনরা নানা মন্তব্য করেছেন।
খোঁজ নিয়ে জানাযায় শিশু দুইটি লক্ষ্মীপুর পৌর সভার ১নং ওয়ার্ড সাহাপুর গ্রামের গৃহবধু ফারহানা আক্তার শিল্পির সন্তান। তাদের একজন লক্ষ্মীপুর পৌর শহীদ স্মৃতি একাডেমীর ৫ম শ্রেণীর ছাত্র শিপন হোসন (১০) ও অপরজন একই স্কুলের দ্বিতীয় শ্রেণীর ছাত্রী তামান্না(৭) সোমবার ছিল তাদের বিদ্যালয়ে প্রথম সাময়িক পরীক্ষা। পরীক্ষা শেষে যখন জানতে পারেন আদালত তাদের মায়ের জামিন বাতিল করে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছেন তখন তারা স্বজনদের সহায়তায় মাকে দেখতে কারা গেইটে ছুটে আসেন। জানাযায়, মারামারির একটি কাউন্টার সাজানো মামলার আসামী ফারহানা আক্তার শিল্পি সহ মামলার আসামীরা সোমবার লক্ষ্মীপুরের সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত( সদর কোর্টে) আত্ন সমর্পন করে জামিন প্রার্থনা করে করলে বিচারক শাহ জামাল মামলার আসামি ফারহানা আক্তার শিল্পি ও জহিরুল ইসলামের জামিনের আবেদন বাতিল করে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন। ফলে শিল্পির সঙ্গে কারাগারে যেতে হয়েছে তার আড়াই বছরের একটি দুধের শিশু সিয়ামকেও।
লক্ষ্মীপুরের সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আমলি আদালত সদরের পেশকার দেলোয়ার হেসেন বলেন, ‘সিআর মামলায় আসামি শিল্পি ও জহির উদ্দিনকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। দুপুরে আদালতের বিচারক শাহ জামাল এ নির্দেশ দিয়েছেন। আমরা আসামিদের আদালতের পুলিশ হাজতে দিয়েছি। পরে বাচ্চাকে কারাগারে নিয়েছে নাকি বাসায় নেওয়া হয়েছে জানি না।’
এদিকে প্রিজনভ্যানের ভেতর মায়ের কোলে থাকা শিশুটি ও জেলগেটে দাঁড়িয়ে থাকা দুই সন্তানের ছবি ফেসবুকে দিয়ে আসামিপক্ষের আইনজীবী মহসিন কবির স্বপন একটি স্ট্যাটাস দিয়েছেন। এর সঙ্গে ঘটনার দিনের একটি ভিডিও তিনি পোস্ট করেছেন।
এ বিষয়ে আইনজীবী স্বপন জানান, ‘দুধের শিশু সিয়ামসহ শিল্পি এখন কারাগারে রয়েছেন। তার অন্য দুই সন্তানের একজন পঞ্চম ও অন্যজন দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী। তারা শহীদ স্মৃতি আদর্শ একাডেমির শিক্ষার্থী। তাদের পরীক্ষা চলমান।’
আসামিপক্ষের আরেক আইনজীবী রাকিবুল হাসান তামিম বলেন, এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে শিল্পি লোহার রড দিয়ে বাদীর মাথায় আঘাত করেছেন। এতে বাদীর মাথা ফেটে মগজ বের হয়ে যায়। এজাহার দেখে আদালত মামলাটি আমলে নিয়ে মেডিকেল সার্টিফিকেট তলব করেন। বাদী মেডিকেল সার্টিফিকেট আদালতে জমা দিয়েছেন। তবে সেখানে সাধারণ জখম উল্লেখ করেছেন চিকিৎসকরা। এতে ঘটনাটি জামিনযোগ্য হলেও আদালত শিল্পিসহ দুজনকে কারাগারে পাঠান। শিল্পির সঙ্গে তার দুধের শিশুও এখন কারাগারে।’
শিশু সন্তানসহ আসামিকে কারাগারে নেওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করে লক্ষ্মীপুর জেলা কারাগারের ভারপ্রাপ্ত জেলার নুর মোহাম্মদ সোহেল এপ্রতিবেদককে জানান, ‘আড়াই বছরের শিশু সিয়ামকে নিয়ে একটি মামলায় তার মা শিল্পি এখন কারাগারে রয়েছে। সোমবার বিকেলে তাদেরকে কারাগারে আনা হয়েছে।’
এজাহার সূত্র জানায়, মামলার বাদী মাহাতাব উদ্দিন ভূঁইয়া। তিনি লক্ষ্মীপুর পৌরসভার ১ নম্বর ওয়ার্ডের সাহাপুর এলাকার মৃত ছিদ্দিক উল্যাহ ভূঁইয়ার ছেলে। ১৫ এপ্রিল তার ওপর হামলার অভিযোগ এনে তিনি অতিরিক্ত চিফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আমলি সদর আদালতে মামলা করেন। এতে প্রতিবেশী শিল্পিসহ ১০ জনের নাম উল্লেখ ও অজ্ঞাত পরিচয় পাঁচজনকে আসামি করা হয়।শিল্পি পৌরসভার সাহাপুর এলাকার ইসমাইল হোসেনের স্ত্রী। মামলায় উল্লেখ করা হয়, শিল্পি রড দিয়ে বাদীর মাথার পেছনে আঘাত করলে বাদীর মাথার হাড় ভেঙে মগজ বের হয়ে যায়।
স্থানীয় সূত্রে জানাযায়, মামলার বাদী মাহতাব ও তার ভাই আফতাবের সাথে ইসমাইল হোসেনদের জমি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলে আসছিল। জমির দখল নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে এপ্রিল মাসে মারামারির ঘটনাঘটে। সে সময় সোস্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হওয়া ভিডিওতে দেখাযায় বাদী মাহতাবের ভাই সাবেক শিবির নেতা ও লক্ষ্মীপুর পৌর মেয়র প্রার্থী আফতাব উদ্দিন শিল্পী সহ নারীদের বেদম ভাবে মারধর করছে।
পরবর্তীতে শিল্পির স্বামীর মামলায় পুলিশ আফতাবকে গ্রেপ্তার করে জেল হাজতে প্রেরণ করেন। এই মামলা থেকে রক্ষা পেতে তারা আদালতে কাউন্টার মামলা দায়ের করলে আদালত মামলাটি আমলে নেন।
শিল্পির জামিনের বিষয়ে জানতে চাইলে লক্ষ্মীপুর জজ আদালতের আইনজীবি মোঃ সাইফুল ইসলাম দীপু খবরের কাগজকে জানান, মঙ্গলবার আদালতে শিল্পির জামিনের আবেদন করা হয়নি। বিধি মোতাবেক ৭দিন পরে আবারো জামিনের আবেদন করা যাবে।
কারা ফটকে মায়ের জন্য দাঁড়িয়ে থাকা শিশু শিপন ও তামান্না তাদের স্বজনদের কাছে নিরাপদে থাকলেও তারা সারাক্ষণ মায়ের জন্য কান্নাকাটি করছেন।